সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বায়ু ও শব্দ দূষণের কবলে চট্টগ্রাম। ফিটনেসবিহীন গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত কালো ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, নগর জুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি এবং হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহারের কারণে দূষণের মাত্রা ভয়াবহ। তাই নগরবাসী মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।
অন্যদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক সংস্কার, সম্প্রসারণ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়েছে। সম্প্রতি নগরীর একে খান মোড়, সিটি গেট, জিইসি মোড়, টাইগারপাসসহ বিভিন্ন এলাকার বাতাস পরীক্ষা করে পরিবেশ অধিদফতর দেখতে পায়, এসব এলাকার বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার (সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট মেটার বা এসপিএম) পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণের বেশি। বাতাসে এসপিএমের সহনীয় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ২০০ মাইক্রোগ্রাম। সেখানে একে খান মোড়ে এর পরিমাণ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম, সিটি গেটে ৪৪০ মাইক্রোগ্রাম, বিআরটিসি মোড়ে ৪৩৫ মাইক্রোগ্রাম, আগ্রাবাদে ৩৯৫ মাইক্রোগ্রাম, ষোলশহরে ৪০৬ মাইক্রোগ্রাম ও টাইগার পাস মোড়ে ৪২৬ মাইক্রোগ্রাম। বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান বিপজ্জনক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামে শব্দ দূষণের মাত্রাও সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। পরিবেশ আইন অনুযায়ী, সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শিল্প এলাকায় শব্দের সহনীয় মাত্রা ৭৫ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় ৫০ ডেসিবল, আর মিশ্র এলাকায় ৬০ ডেসিবল। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা যায়, নগরীর খুলশী (আবাসিক) এলাকায় শব্দের মাত্রা ছিল ১০৬ ডেসিবল, ইস্পাহানি মোড়ে ১১০ ডেসিবল, একে খান গেট (শিল্প) এলাকায় ১৩৫ ডেসিবল, পাহাড়তলী এলাকায় ১৫৫ ডেসিবল।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুর রহমান বলেন, ধুলাবালির কারণে বাচ্চারাই সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে। বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার কারণে শিশুদের নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে। মারাত্মক বায়ু দূষণের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত অ্যাজমা, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ মারাত্মক ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উচ্চমাত্রার শব্দ দূষণের কারণে শ্রবণেন্দ্রিয়ের সমস্যা তৈরি হয়। দেখা দেয় ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ জটিল রোগ-ব্যাধি। ধুলাবালিতে অ্যাজমা ও হাঁপানি রোগীদের অবস্থা বেশি খারাপ হয়। এছাড়া ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে ঢুকে নানা রোগের সৃষ্টি করে।
সিএমপি সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (৬ জানুয়ারি) থেকে ট্রাফিক বিভাগ চট্টগ্রামে গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং শব্দ দূষণ রোধে হাইড্রোলিক হর্ণের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। বিভিন্ন যানবাহন থেকে হাইড্রোলিক হর্ণ নামিয়ে ফেলা হচ্ছে। বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এই অভিযান বেশ কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চট্টগ্রামের সভাপতি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, সামগ্রিকভাবে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামের পরিবেশ দূষণের মাত্রা ক্রমশ ভয়ানক পর্যায়ে যাচ্ছে। গাড়ির ধোঁয়ার পাশাপাশি ইটের ভাটা, ট্যানারি বর্জ্য, শিল্প বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য, যত্রতত্র গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলাসহ নানা কারণেই পরিবেশের এ বিপর্যয় ঘটেছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহারের কারণে শব্দ দূষণের মাত্রা বেড়েছে। বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতরের সিনিয়র রসায়নবিদ জমির উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামে বায়ু দূষণের সঙ্গে শব্দ দূষণও দিন দিন বাড়ছে। শীত মৌসুমের শুরুতেই বাতাসে বস্তুকণার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। স্বাভাবিক নিয়মে যার সহনীয় পরিমাণ ২০০ এসপিএম হলেও এখন তা চারশ’তে গেছে।
বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, নগরীতে প্রায় ২৫ হাজার যানবাহন চলাচল করছে, যেগুলোর ফিটনেস নেই। নগরীতে চলাচলকারী যানবাহনের প্রায় ৩৫ শতাংশই ফিটনেসবিহীন। এসব যানবাহন কালো ধোঁয়া সৃষ্টি করছে এবং হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহার করছে। ফলে বায়ু ও শব্দ দূষণ বাড়ছে।
এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতর পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, নিষিদ্ধ পলিথিন আটকসহ বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করলেও বায়ু ও শব্দ দূষণ বিরোধী অভিযান বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। অন্যদিকে অভিযানে দায়ের করা মামলার তদন্তে অগ্রগতি না থাকায় পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম পরিবেশ আদালত সূত্রে জানা যায়, পরিবেশ আদালতে বর্তমানে তিন শতাধিক মামলা বিচারাধীন। অধিকাংশ মামলার তদন্ত রিপোর্ট এখনও আদালতে পৌঁছেনি।
